জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদারে বিদেশী বিনিয়োগ নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে জাপান। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো বিদেশী বিনিয়োগকে দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে কর্তৃপক্ষ তা বাতিলের পরিবর্তে মালিকানা পুনর্বিক্রির (ডাইভেস্টমেন্ট) আদেশ দিতে পারবে। অর্থাৎ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর নির্দিষ্ট শর্তে ওই শেয়ার বিক্রি করে দিতে বিদেশী বিনিয়োগকারীকে বাধ্য করা হতে পারে। দেশটির বিদেশী বিনিয়োগ তদারকি আইনে এ সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে। খবর রয়টার্স।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রশাসন বিদেশী অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জাপানি কোম্পানি ও সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত রাখতে চাচ্ছে। বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে আগেভাগে জানানোর প্রয়োজন হয় না। ফলে ওই সব ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ করারও কোনো সুযোগ থাকে না। নতুন আইন পাস হলে বিনিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত যেকোনো লেনদেন পর্যালোচনা করার ক্ষমতা পাবে সরকার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ পদক্ষেপের অন্যতম লক্ষ্য হলো জাপানি প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে চীনাদের মালিকানায় চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করা। জাপানের বোর্ড ডিরেক্টর ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা নিকোলাস বেনেস বলেন, ‘জাপান চায় না দেশটির সেরা কোম্পানি ও প্রযুক্তিগুলোকে কোনো চীনা প্রতিষ্ঠান কিনে নিক। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও জার্মানির মতো মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সংগতি বজায় রেখেই জাপান এ তদারকি ব্যবস্থা চালু করছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন বেশ সাধারণ একটি প্রক্রিয়া।’
২০১৯ সালের পর এটিই জাপানের বিদেশী বিনিয়োগ আইনে সবচেয়ে বড় সংস্কার। ওই সময় বিনিয়োগ পর্যালোচনার সীমা ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। জাপানের ল ফার্ম মোরি হামাদা অ্যান্ড মাতসুমোতোর অংশীদার ও আইনজীবী ইয়োহসুকে হিগাশির মতে, চীনা বিনিয়োগকারীদের বাদ দিলে নতুন এ আইন অন্যান্য বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। কারণ জাপান এখনো বিদেশী বিনিয়োগের জন্য একটি উন্মুক্ত বাজার হিসেবে পরিচিত।
তদারকি কঠোর করা হলেও জাপানে বিদেশী বিনিয়োগ (একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ বা এমঅ্যান্ডএ) প্রবাহ থামবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এলএসইজির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জাপানে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। এর আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
দাইওয়া ইনস্টিটিউট অব রিসার্চের গবেষক ইউকি কানেমোতো বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, জাপান ইউরোপ বা আমেরিকার তুলনায় বেশি শিথিল। কিন্তু বাস্তবে পর্দার আড়ালে অনেক বিনিয়োগ প্রস্তাবই নাকচ হয়ে যায়।’
নতুন এ নীতিমালার আওতায় বিদেশী মূল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাপানি কোম্পানিতে পরোক্ষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, যাচাই-বাছাইয়ের পরিধি বাড়ায় তদারকি দলের ওপর কাজের চাপ অনেক বেড়েছে, তাই গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে লন্ডনের চিলড্রেনস ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে ‘ইলেকট্রিক পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট’ কেনার প্রস্তাবটিই জাপানে এখন পর্যন্ত বাতিল হওয়া একমাত্র বড় চুক্তি।